বংশেরবাতি বা বংশের প্রদীপ কি?
আদিম কাল থেকে মানুষ একটা ভুল ধারণা পোষন করে আসছে!
একদিন আমার পরিচিত একজন লোকের কয়জন ছেলেমেয়ে তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। এর মধ্যে এক ব্যক্তির প্রসঙ্গ আসল যার চারটি মেয়ে কিন্তু একটিও ছেলে নেই। যারা কথা বলছিলেন তার মধ্যে এক মুরুব্বী বলে উঠলেন "আহা এত ভাল লোকটা, অথচ নির্বংশ হয়ে গেল!"
আবার ছোট বেলা থেকেই মা বলত "বাবার রক্ত গায়ে তাই ছেলে আমাদের মত হবে কেন, ওই বংশের স্বভাব আচরণ পেয়েছে!" যদিও সেটা একদমই ভুল ছিল!
আবার নানার বাসায় আমার একমাত্র মামাত ভাইকে বংশের একমাত্র প্রদিপ বলা হত, আর আমি ভাবতাম মামার তো আরোও দুইটা মেয়ে আছে, ওরা বংশের প্রদিপ নয় কেন? মামা-খালাদের ছেলেমেয়ে মিলিয়ে তখন ৯ জন কাজিন ছিলাম আমরা,(পরে আরও কাজিন হয়েছে) মনে প্রশ্ন জাগত ৯ জনের মদ্ধে একজনকেই বংশের প্রদিপ বলা হয় কেন? আমার মা যেমন নানার সন্তান নানা-নানির বীজে জন্ম, তেমনি মামার মেয়ে গুলাও তার রক্ত বহন করে সেই হিসেবে আমরা ৯ জনই অর্থাৎ ছেলের ছেলে, ছেলের মেয়ে, মেয়ের মেয়ে ও মেয়ের ছেলে সবার গায়েই নানার রক্ত থাকার কথা, কারন তিনিতো ছেলে মেয়ে দুজনকেই জন্ম দিয়েছেন ! তখন এটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতাম না, এক কানে নিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিতাম!
বাবার পরিবারেও তাই দেখতাম! আমার বাবা তার বড় ভাইয়ের পরিবারের প্রতি আর ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের প্রতি অনেক টান থাকলেও বড় বোনের ছেলেমেয়ে গুলোর প্রতি তেমন আবেগ তার ছিল না, কারণ বোনের ছেলেমেয়েরা বংশের কেউ না!
আবার একবার আমাদের এলাকায় এক ব্যক্তি সম্পত্তি ভাগ করেছে, ওনার একটা ছেলের খুব রাগ, বোনেরা কেন অংশ পাবে! "আমার বাবা নিজের ছেলেকে ঠকিয়েছে! আরে বোনের ছেলে মেয়েরা কি আমাদের বংশের কিছু হয় নাকি? বোনের জামাইয়ের বংশধর অরা, অরা কেন পাবে? বোন-দুলাভাই আর ওদের ছেলেমেয়েদের তো বাড়ীতেই ঢুকতে দেওয়া উচিৎ না!" ইত্যাদি ইত্যাদি! আমি তো শুনে আকাশ থেকে পরলাম!
ব্যাপার খানা আমার মাথায় একেবারেই ঢুকতোই না! বাবা মা দুজনে মিলে সন্তান জন্ম দেয়, বংশের ধারক বাহক ফ্যাক্টর জ্বিন-ক্রোমোজোম বাবা ও মা দুজনের থেকেই পায় তাদের সন্তান , ডিম্বানু বা এক্স ক্রোমোজোম ছাড়া সন্তান জন্মানো সম্ভবই না! কিন্তু সন্তানকে শুধু বাবার বংশের বাচ্চা বলা হয় কেন? আবার ঠিক একই ভাবে বাবা ও মা দুজনের বীজ থেকে ছেলে ও মেয়ে দুজনেই জন্ম হয়, ছেলে সন্তান ও মেয়ে সন্তান দুজনেই সমান সমান বাবা-মায়ের বংশের ইনফরমেশন বহন করে, অথচ শুধুমাত্র ছেলেকেই বংশের প্রদীপ বলা হচ্ছে আর ছেলে সন্তান না থাকলে হাজারটা মেয়ের বাবা মা হলেও নির্বংশ! কিভাবে?
রূপকথা বা রাজা-রানীদের গল্পেও "এক রাজার সাত মেয়ে, কিন্তু কোনও ছেলে নেই তাই রাজার দুঃখ" এমন গল্প হাজারটা শোনাযায়! আবার পৌরানিক ইতিহাস বা ধর্মীয় কাহিনি গুলোতেও একই দৃশ্য দেখা যায়, বাবা মেয়ে সন্তান মেনে নিতে পারছে না তাই সে নিজের মেয়েকেই অভিশ্বাপ দিচ্ছে, বা ছেলে সন্তান নেই তাই সেই ব্যক্তি নির্বংশ!
এই জিনিশটা নিয়ে মাঝেমধ্যে মাথায় গোল পাকাতো!
বছর দুয়েক আগের কথা, ফেসবুকে আমার এক পরিচিত পশ্চিমবঙ্গের বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ভাই একটা স্ট্যাটাস লিখলেন! সেখানে তিনি একটি প্রাচিন ধর্মীয় শাস্ত্রের একটা কথা উল্লেখ করেছিলেন! কথাটি কিছুটা এমন "বাবা হচ্ছে বৃক্ষের ন্যায় আর মা ভুমির ন্যায়, বৃক্ষ হতে বীজ এনে জমিতে লাগালে তবেই নতুন শিশু চারাগাছ জন্মাবে"! এই কথাটা পড়ার পরে আমার মাথায় জিনিশটা পরিষ্কার হল! এত বছরের কনফিউশন এতদিনে ক্লিয়ার হল!
"বাবা হচ্ছে বৃক্ষের ন্যায় আর মা ভুমির ন্যায়, বৃক্ষ হতে বীজ এনে জমিতে লাগালে তবেই নতুন শিশু চারাগাছ জন্মাবে"-কথাটি অতি সহজ সরল, বংশপরম্পরা বিষয় প্রায় সব সামাজিক প্রথা আর প্রায় সকল ধর্মই এমন কথাই বলে, অনেকের দৃষ্টিতে কথাটি "ঠিকই তো" ও হতে পারে! কিন্তু এই ছোট্ট কথাটিতে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর একটি ভ্রান্ত ধারনা, এমন একটি কুসংস্কার যা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে আমাদের মাঝে আর কারণ হয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে ভয়ংকর সব অমানবিক ঘটনার!
কথাটি আবারও দেখুন, "বাবা হচ্ছে বৃক্ষের ন্যায় আর মা ভুমির ন্যায়, বৃক্ষ হতে বীজ এনে জমিতে লাগালে তবেই নতুন শিশু চারাগাছ জন্মাবে"-
-একই গাছের বীজ/চারা অনেক জমিতে লাগানো যায়, আবার একাধিক প্রজাতির গাছের বিজ/চারা একই বাগানে লাগানো হতে পারে, কিন্তু সে যে গাছেরই বীজ/চারা যে জমিতেই লাগানো হোউক না কেন জন্মানো চারাগাছটি মাতৃ গাছেরই বংশধর হবে, সুধু দশমাস নয় আজীবন জমিতে দাঁড়িয়ে থেকে আজীবন সেই জমি থেকে সাড়-পানি খেয়ে বৃক্ষ বেচে থাকলেও বৃক্ষ কখনোই জমির বংশধর বা জমির সন্তান হিসেবে পরিগণিত হবে না, যে গাছের বিজে জন্মে চারাগাছ সেই গাছেরই বংশধর জমির নয়! অর্থাৎ "গাছ ও জমি" এর সাথে যথাক্রমে "বাবা ও মা"এর তুলনা এই ভুল ধারনা থেকে আসে যে বাবার দেহ থেকে আসা "এক বিন্দু" বীর্য থেকেই সম্পূর্ণ সন্তান ডেভেলপ হয়! এখানে ভুল হল গাছের বিজ হচ্ছে ভ্রূণ, অর্থাৎ যে বীজ ভুমিতে লাগালে নতুন চারা জন্মাবে সেটা আসলে বাবার বীর্য বা শুধুমাত্র শুক্রাণু নয় বরং বাবার শুক্রাণু ও মায়ের ডিম্বাণুর মিলনের ফলে যে সম্পূর্ণ ভ্রুন সৃষ্টি হয় বীজটি তাই! অর্থাৎ গাছের বীজ শুধু বাবার অংশ নয় যেমনটি ওই উক্ত কথাটিতে দাবি করা হচ্ছে, বীজ হচ্ছে বাবা ও মা এর দুজনারই অংশের মিলিত পরিপূর্ণ ভ্রুন! বেশিভাগ গাছ উভয়লিঙ্গ এর(অর্ধনারীশ্বর এর ন্যায়) হয়ে থাকে, অর্থাৎ গাছটি বাবা নয় বরঞ্চ বাবা ও মা দুইই! পরাগ হল শুক্রাণু বা বাবার থেকে আসা অংশ আর পরাগায়নের ফলে সেই বাবার অংশ মায়ের অংশ(ডিম্বাণু) এর সাথে মিলিত হলে তবেই বীজের সৃষ্টি! এক্ষেত্রে শুধু পরাগ বা শুধু ডিম্বানু বা অপরিপক্ক বীজ এনে জমীতে বুনে দিলে কখনোই চারাগাছ জন্ম হবে না! পরাগায়নের পর বাবা ও মায়ের অংশ মিলিত হওয়ার পর বীজ পরিপক্ক হয়ে লাগানোর উপযোগী হওয়ার পর জমিতে লাগালে তবেই তা চারাগাছ হতে পারবে!
অর্থাৎ "পিতা হচ্ছে বৃক্ষের ন্যায়" আর "নারীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র" কথাগুলো সেই প্রাচীন ভুল ধারনারই প্রতিফলন!
বাবার দেহ থেকে আসা বীর্য সম্পূর্ণ সন্তান জন্ম দেয় না! মায়ের দেহে থাকা ডিম্বানুর সাথে তা মিলিত হয়ে ভ্রুন সৃষ্টি হলেই তা থেকে সন্তান জন্ম হবে!
অথচ আগেকার দিনের মানুষদের এমনকি বড়বড় পন্ডিত বা ধর্মগুরুদেরও এইটা জানাছিল না মায়ের দেহে আগে থেকেই ডিম্বানু গুলো থাকে, যেটাতে মায়ের বংশের বংশগতির ফ্যাক্টর গুলো ততটুকুই থাকে যতটুকু বাবার থেকে আসা শুক্রাণু বহন করে, অর্থাৎ প্রতিটি সন্তান ততটুকুই মায়ের বংশধর যতটা বাবার!
আবার ছেলে সন্তান ভবিষ্যতে বাবা হবে আর মেয়ে হবে মা, অর্থাৎ আগের ভুল ধারণা অনুযায়ী বংশের বীজ ছেলে সন্তান বহন করবে আর ফরওয়ার্ড করবে যা মেয়ে সন্তান করতে পারবে না, আর এজন্যই আগের "ভুল ধারণা" অনুযায়ী ছেলে সন্তান কে বংশেরবাতি বলা হয় আর সুধু ছেলের ঘরের ছেলে সন্তান(নাতিকেই) বংশেরবাতি বলাহয়(ছেলের মেয়েদের আর মেয়ের সন্তানদের নয়)!
অথচ আধুনিক মেডিকেল সাইন্স বলে মেয়ে সন্তান মা হবে এবং X ক্রোমোজোম সহ বংশের বৈশিষ্ট্য বহনকারী ২৩টি ক্রোমোজোম সমৃদ্ধ ডিম্বানু বহন করবে আর তার সন্তানদের মদ্ধে বংশের বীজ ফরওয়ার্ড করবে, অর্থাৎ মেয়ে সন্তানও বংশের প্রদীপ, আর ছেলে ও মেয়ে দুইটি সন্তানই বাবা ও মা দুজনেরই বংশের প্রদীপ!
এখনও আরও কথা বাকি আছে! X ও Y ক্রোমোজোম এর কিছু পার্থক্য রয়েছে! X ক্রোমোজোম আকারে Y ক্রোমোজোম এর তুলনায় অনেক বড় হয় ও অনেক বেশী তথ্য বহন করে! Y ক্রোমোজোম প্রধান কাজ পুরো ভ্রুণের মধ্যে একটি পরিবর্তন আনা যা ভ্রুনটিকে ছেলে শিশু তে পরিণত করবে, Y ক্রোমোজোম না হলে এই পরিবর্তন হয় না আর শিশুটি মেয়ে হয়! আধুনিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে X ক্রোমোজোম মেধা ও পারসোনালিটি রিলেটেড গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য বহন করে! একটি ছেলে যার শরীরে XY ক্রোমোজোম থাকে আর সে সুধু মায়ের থেকেই X ক্রোমোজোম পায়, অর্থাৎ সে ততটাই মেধাবী হবে যতটা তার মা ও নানা/নানি মেধাবী! অপরপক্ষে মেয়ে বাচ্চা মা ও বাবা দুজনার কাছ থেকেই X ক্রোমোজোম পায় যার একটি সক্রিয় ও অপরটির বেশিরভাগ অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে! বেশিরভাগ অংশ নিষ্ক্রয় হওয়া X ক্রোমোজোমটিতে Y ক্রোমোজোমের সমপরিমাণ জিন সক্রিয় থাকে! এখানে দেখাযাচ্ছে যে একজন মেয়ের তার দাদী বা মা দুজনার যেকোনো একজনের আর ছেলের সুধু মায়ের X ক্রোমোজোম সক্রিয় থাকে, অর্থাৎ এখানেও মায়েদের ভুমিকাই দেখা যাচ্ছে! আর এটা সুধু লিঙ্গ নির্ধারক ক্রোমোজোম এর কথা বললাম, বাকি ২২টি বংশ বৈশিষ্ট্য বহনকারী ক্রোমোজোম ছেলে ও মেয়েরা সমান পায় ও প্রতিটি শিশু বাবার থেকে যা পায় মায়ের থেকেও তাই পায়, অর্থাৎ বাবা ও মা দুজনারই বংশ বহনকরে!
প্রতিটি জীব যে মায়ের বংশের যথেষ্ট বৈশিষ্ট্য পায় তার প্রমান হল হাইব্রিড জীব গুলো! সিংহ বাবা ও বাঘ মায়ের মিলনে যে লাইগার জন্ম হয় সেই লাইগারে সিংহ বাবা ও বাঘ মায়ের দুজনেরই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, বরং মায়েরই বৈশিষ্ট্য বেশি থাকে, যেমন বাঘের মত (আবছা) ডোরাকাটা দাগ থাকে, শরীরের গড়ন বাঘের মত হওয়া কিংবা পুরুষ লাইগারের সিংহের মত কেশর না হয়ে বাঘের মত হওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি!
যেব্রা আর গাধার মিলনে যে যিব্রয়েড বাছুর জন্মায় তারও বাবা ও মা দুজনারই বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়!
মানুষের বাচ্চা হলে সেই শিশুর চেহারা ও পারসোনালিটি সুধু বাবা নয় বরং বাবা ও মায়ের দুজনারই পরিবারের মানুষদের সাথে যথেষ্ট মিল থাকে! আবার গাছ বা ফুলের ক্রস ব্রিডিং এর ক্ষেত্রেও নতুন প্রজাতিটিতে বাবা ও মা দুজনারই বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়! যদিও ক্রসব্রিডিং এর ফলে কোন কোন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাবে তা ডিপেন্ড করে বৈশিষ্ট্য বহনকারী জিন কতটা প্রকট তার উপর, অর্থাৎ যে জিন যতটা ডমিনেন্ট সে জিনের বৈশিষ্ট্য গুলো প্রকাশ পাবে, বাবার কোনও জিন ডমিনেন্ট হলে তার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাবে আর মায়ের কোনোটা ডমিনেন্ট হলে তা প্রকাশ পাবে! তবে প্রকাশ পাক আর নাই পাক, শিশু অবশ্যই মায়ের জিন বহন করবে, আর তার পরের প্রজন্মও সেই জিন প্রাপ্ত হবে!
মুরগি যখন ডিম দেওয়া বন্ধ করে দেয় তখন তার শেষ ঠিকানা কসাইখানা হয়, আর কোনও মুরগি যদি অন্য বাড়িতে গিয়ে ডিম পাড়ে তাহলে সেই মুরগির মালিক আরও আগে সেটাকে জবাই করে! আমাদের পাশের বাড়ির আন্টির একটা মুরগি অন্য বাড়িতে গিয়ে ডিম পারত তাই রাগে তিনি মুরগিটাকে অত্যন্ত বীভৎস ভাবে আছাড় মেরে মেরেফেললেন! শুনতে খারাপ লাগলেও বাস্তব কথা এইটাই যে আমাদের সমাজে মেয়েশিশুদের পরিস্থিতি অনেকটা ওই মুরগিটার মতই! "সন্তান জন্ম দিব আমি আর সেই সন্তান আমার বীজ বহন করবেনা, আবার মা হয়ে অন্য পুরুষের বংশধর গর্ভে ধারণ করবে! এই সন্তান বা মেয়েশিশু পালন করাটা সেই মুরগিকে (যেটা অন্য বাড়িতে যেয়ে ডিম দিয়ে আসল) দানা পানি খাওয়ানোর মতই মনে করা হয়! অর্থাৎ মেয়েশিশুকে বাঁচিয়ে রাখাটাও যেন তার প্রতি অকারণ দয়া দেখানো ছাড়া কিছুই নয়!"
আবার যেহেতু এই বিশ্বাস যে সুধু ছেলেরাই বংশের প্রদীপ আর মেয়েরা বংশ বহন করেনা সুধু স্বামীর বীজ ক্ষণিক গর্ভেধারণ করে মাত্র, তাই মেয়েদের অনেকটাই খালি পাত্রের মতও দেখা হয়, যার যেমন ইচ্ছা তার সাথে আচরণ করুক, সেতো আর মানুষ হিসেবে পুরুষের সমান নয়! কথাগুলো খারাপ লাগলেও সত্যি যে আমাদের আদি প্রথা, সামাজিক কুসংস্কার আর ভুল বিশ্বাস গুলো আমাদের এই মানসিকতা ধারণ করাচ্ছে, আর এই ভুল ধারনার কারনেই বৈসম্যের শিকার হচ্ছে নারী সমাজ, বঞ্চিত হচ্ছে সম অধিকার থেকে, আবার লাঞ্ছিত-নির্যাতিত হচ্ছে সমাজের দশজনের হাতে! রাস্তার বখাটেরা যেখানে সেখানে অপমান করছে, প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও বীভৎস ভাবে কুপিয়ে বা এসিড ছুড়ে দিচ্ছে! আবার ধর্ম ও পর্দানশীন সমাজ চোখের উপর পর্দা বেধে উলটা ভিক্টিম মেয়েটাকেই দোশারপ করছে! কারন ও মেয়ে, ও তো মানুষ নয়, ও ডিম না দেওয়া মুরগি কিংবা খালি পাত্র বা হস্তান্তর যোগ্য আসবাবপত্রের সমান, তাই মেয়েটির সম অধিকার/ন্যায় বিচার/মৌলিক অধিকার পাওয়ার দরকার নেই!
আমার এই কথা গুলো হয়ত খুব অফেন্সিভ লাগবে আবার সামাজিক প্রথা/বিশ্বাস বা ধর্মের সাথেও বিরোধপূর্ণও মনে হতে পারে, কেউ হয়ত এটা পড়ে আমাকে গালাগালিও করবেন! কিন্তু এটাই সত্য যে "মেয়েরা বংশের ধারক/বাহক প্রদীপ নয়" এমন ভুল বিশ্বাসই আমদের এত হাজার হাজার বছর ধরে নারী নির্যাতন করিয়েছে, ঐ ভ্রান্ত ধারনা আমাদের মধ্যে নারী নির্যাতনের মানসিকতার প্রসার করিয়েছে!
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আর মেডিকেল সায়েন্সের কাছে অকাট্য দলিল থাকা সত্যেও আমরা এই আধুনিক যুগেওও সেই প্রাচীন যুগের ভুল ধারনা গুলো ধরে রেখেছি! আর শুধুমাত্র এই ভুল ধারনাটির কারনে বৈসম্যের শিকার হচ্ছে পৃথিবীর লক্ষ-কোটি মেয়ে শিশু! তৃতীয় বিশ্বের ও ধর্মান্ধ সমজগুলোতে লাখ লাখ মেয়েশিশুকে গর্ভপাত করে হত্যা করা হচ্ছে কিংবা নবজাতক মেয়েশিশুকে জ্যান্ত অবস্থায় ময়লার মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, আর যে মেয়েটা ভাগ্যক্রমে বেচে গেল তাকে সহ্য করতে হয় আজিবন লাঞ্চনা!
"মেয়েরা বংশের ধারক/বাহক প্রদীপ নয়" -এই ভুল বিশ্বাসের কারণে আমরা জেন্ডারসাইড চালিয়েছি আর মেয়ে ভ্রুন হত্যা করেছি! জেন্ডারসাইডের মাধ্যমে নির্মম বীভৎস হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে কোটি কোটি মেয়ে শিশু ও আজও তা নির্বিচারে চলছে!
"স্ত্রী কে মারধর করাকে অপরাধ না মনে করা, স্বামী যখন যেমন খুশি আচরন করবে/দুর্ব্যবহার করবে/ইচ্ছে হলেই অকারণেই তালাক দিয়ে দিবে/স্ত্রীকে মানসিক ও ইমোশনাল অত্যাচার করবে/ফেলে চলে যাবে আবার অন্যত্র গিয়েও সেখান থেকেই অত্যাচার চালাবে -এগুলোকেও স্বামীর(পুরুষ হিসেবে) জন্মসূত্র অধিকার মনেকরা, স্ত্রীর/পাত্রীর কোনও তুচ্ছ/কাল্পনিক কোনও ত্রুটি highlight করে যৌতূক চাওয়া কে সঠিক ভাবা, একাধিক স্ত্রী ও দাসী (সঙ্গিনী) গ্রহন করা, স্ত্রী দাসী হইয়া স্বামীর সঙ্গে যাবে এমন ধারনা, স্ত্রী দাসী হয়ে স্বামীর পায়ে থাকবে এটাকে সঠিক নিয়ম মনে করা কিংবা স্ত্রীকে প্রয়োজনে মারধর করা যায় এমন ধারনা পোষণ করা, স্ত্রীলোক/মেয়েমানুষ স্বাধীন, স্বনির্ভর, সুশিক্ষিতা ও পুরুষের সমকক্ষ কখনোই হতে পারবে না, কিংবা মানুষ হিসাবে মেয়েরা পুরুষের সম অধিকার পাওয়ার যোগ্য নয়, কিংবা বাবা-মায়ের সম্পদের অংশ মেয়েরা পাবে না কিংবা পেলেও অধিকারে ছেলেদের সমান কখনওই হবে না, ছেলে সন্তান না থাকলে সম্পত্তি রক্ষার জন্য ভাইয়ের ছেলে/চাচাত ভাইকে দিয়ে দেওয়া, বাবা/স্বামীর বংশ পরিচয় ধারণ করা," -এই প্রতিটা কূৎসিত ধারনার জনকই ওই একটাই ভুল থিওরি "মেয়েরা বংশের ধারক/বাহক প্রদীপ নয়" যেটা আশ্চর্যজনক ভাবে আমরা এই বিজ্ঞানের যুগেও মানছি!
এ যুগে "নারী দিবস", "নারীর সমঅধিকার" মিনা কার্টুনের "মাইয়াগো যত্ন লও" কিংবা "পোলাই হইতে হইব এমন কোনও কথা নাই" বা "বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও" এর মত হাজারটি মানবিক আবেদনও মেয়েদের রক্ষা করতে ব্যর্থ কারন প্রতিটিতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিষকে ইগনোর করা হয়েছে, আর তা হল ওই "মেয়েরা বংশের ধারক/বাহক প্রদীপ নয়" এই ভুল ধারনাটিকে হটানোর চেষ্টা, আর এই ভুল ধারনাটি যতদিন আমাদের মাঝে প্রচলিত আছে আর যতদিন না আমরা সামাজিক ও ধর্মীয় প্রথার বাইরে যেতে পারব না ততদিন আমরা মেয়ে শিশুটিকে বাঁচাতে পারব না, আর ততদিন "বেটি বাচাও বেটি পড়াও"এর মত আবেদনগুলো আমাদের কাছে ডিম না পাড়া মুরগিকে হত্যা না করার আবেদনের মতই মনে হবে! আর তাই নারীর সম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে প্রথমে এই ভুল ধারনাটি মানুষের মন থেকে হটাতে হবে, মানুষদের সচেতন করতে হবে, এই জানাতে হবে যে সুধু ছেলে নয়, ছেলে ও মেয়ে দুজনেই বাবা ও মা দুজনারই বংশের বীজ বহন করে!
আমার এই লিখাটি পরে অনেকেই আমাকে অপছন্দ করবে, আমি যে অনেকেরই চক্ষুশূল হব আমি তা ভাল ভাবেই জানি! কিন্তু একজন ডাক্তার হিসেবে আমি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি আর এই কথা গুলো মানুষ কে জানানো আমার কর্তব্য মনেকরি! যদি আমার লেখা এই আর্টিকেল পড়ার কারনে একটি কন্যা শিশুও এ্যবর্শন থেকে রক্ষা পায়, যদি একজন বাবারও মন গলে, তবেই আমার লেখা সার্থক হবে!
আর তাই আমি আমার সব শিক্ষিত, শুভ চিন্তাশীল ও বিজ্ঞান মনস্ক বন্ধুদের অনুরোধ জানাব এই তথ্যটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য!
- ডাঃ আকাশ, শেখ আনোয়ার ঊল্লাহ খন্দকার!
আদিম কাল থেকে মানুষ একটা ভুল ধারণা পোষন করে আসছে!
একদিন আমার পরিচিত একজন লোকের কয়জন ছেলেমেয়ে তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। এর মধ্যে এক ব্যক্তির প্রসঙ্গ আসল যার চারটি মেয়ে কিন্তু একটিও ছেলে নেই। যারা কথা বলছিলেন তার মধ্যে এক মুরুব্বী বলে উঠলেন "আহা এত ভাল লোকটা, অথচ নির্বংশ হয়ে গেল!"
আবার ছোট বেলা থেকেই মা বলত "বাবার রক্ত গায়ে তাই ছেলে আমাদের মত হবে কেন, ওই বংশের স্বভাব আচরণ পেয়েছে!" যদিও সেটা একদমই ভুল ছিল!
আবার নানার বাসায় আমার একমাত্র মামাত ভাইকে বংশের একমাত্র প্রদিপ বলা হত, আর আমি ভাবতাম মামার তো আরোও দুইটা মেয়ে আছে, ওরা বংশের প্রদিপ নয় কেন? মামা-খালাদের ছেলেমেয়ে মিলিয়ে তখন ৯ জন কাজিন ছিলাম আমরা,(পরে আরও কাজিন হয়েছে) মনে প্রশ্ন জাগত ৯ জনের মদ্ধে একজনকেই বংশের প্রদিপ বলা হয় কেন? আমার মা যেমন নানার সন্তান নানা-নানির বীজে জন্ম, তেমনি মামার মেয়ে গুলাও তার রক্ত বহন করে সেই হিসেবে আমরা ৯ জনই অর্থাৎ ছেলের ছেলে, ছেলের মেয়ে, মেয়ের মেয়ে ও মেয়ের ছেলে সবার গায়েই নানার রক্ত থাকার কথা, কারন তিনিতো ছেলে মেয়ে দুজনকেই জন্ম দিয়েছেন ! তখন এটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতাম না, এক কানে নিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিতাম!
বাবার পরিবারেও তাই দেখতাম! আমার বাবা তার বড় ভাইয়ের পরিবারের প্রতি আর ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের প্রতি অনেক টান থাকলেও বড় বোনের ছেলেমেয়ে গুলোর প্রতি তেমন আবেগ তার ছিল না, কারণ বোনের ছেলেমেয়েরা বংশের কেউ না!
আবার একবার আমাদের এলাকায় এক ব্যক্তি সম্পত্তি ভাগ করেছে, ওনার একটা ছেলের খুব রাগ, বোনেরা কেন অংশ পাবে! "আমার বাবা নিজের ছেলেকে ঠকিয়েছে! আরে বোনের ছেলে মেয়েরা কি আমাদের বংশের কিছু হয় নাকি? বোনের জামাইয়ের বংশধর অরা, অরা কেন পাবে? বোন-দুলাভাই আর ওদের ছেলেমেয়েদের তো বাড়ীতেই ঢুকতে দেওয়া উচিৎ না!" ইত্যাদি ইত্যাদি! আমি তো শুনে আকাশ থেকে পরলাম!
ব্যাপার খানা আমার মাথায় একেবারেই ঢুকতোই না! বাবা মা দুজনে মিলে সন্তান জন্ম দেয়, বংশের ধারক বাহক ফ্যাক্টর জ্বিন-ক্রোমোজোম বাবা ও মা দুজনের থেকেই পায় তাদের সন্তান , ডিম্বানু বা এক্স ক্রোমোজোম ছাড়া সন্তান জন্মানো সম্ভবই না! কিন্তু সন্তানকে শুধু বাবার বংশের বাচ্চা বলা হয় কেন? আবার ঠিক একই ভাবে বাবা ও মা দুজনের বীজ থেকে ছেলে ও মেয়ে দুজনেই জন্ম হয়, ছেলে সন্তান ও মেয়ে সন্তান দুজনেই সমান সমান বাবা-মায়ের বংশের ইনফরমেশন বহন করে, অথচ শুধুমাত্র ছেলেকেই বংশের প্রদীপ বলা হচ্ছে আর ছেলে সন্তান না থাকলে হাজারটা মেয়ের বাবা মা হলেও নির্বংশ! কিভাবে?
রূপকথা বা রাজা-রানীদের গল্পেও "এক রাজার সাত মেয়ে, কিন্তু কোনও ছেলে নেই তাই রাজার দুঃখ" এমন গল্প হাজারটা শোনাযায়! আবার পৌরানিক ইতিহাস বা ধর্মীয় কাহিনি গুলোতেও একই দৃশ্য দেখা যায়, বাবা মেয়ে সন্তান মেনে নিতে পারছে না তাই সে নিজের মেয়েকেই অভিশ্বাপ দিচ্ছে, বা ছেলে সন্তান নেই তাই সেই ব্যক্তি নির্বংশ!
এই জিনিশটা নিয়ে মাঝেমধ্যে মাথায় গোল পাকাতো!
বছর দুয়েক আগের কথা, ফেসবুকে আমার এক পরিচিত পশ্চিমবঙ্গের বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ভাই একটা স্ট্যাটাস লিখলেন! সেখানে তিনি একটি প্রাচিন ধর্মীয় শাস্ত্রের একটা কথা উল্লেখ করেছিলেন! কথাটি কিছুটা এমন "বাবা হচ্ছে বৃক্ষের ন্যায় আর মা ভুমির ন্যায়, বৃক্ষ হতে বীজ এনে জমিতে লাগালে তবেই নতুন শিশু চারাগাছ জন্মাবে"! এই কথাটা পড়ার পরে আমার মাথায় জিনিশটা পরিষ্কার হল! এত বছরের কনফিউশন এতদিনে ক্লিয়ার হল!
"বাবা হচ্ছে বৃক্ষের ন্যায় আর মা ভুমির ন্যায়, বৃক্ষ হতে বীজ এনে জমিতে লাগালে তবেই নতুন শিশু চারাগাছ জন্মাবে"-কথাটি অতি সহজ সরল, বংশপরম্পরা বিষয় প্রায় সব সামাজিক প্রথা আর প্রায় সকল ধর্মই এমন কথাই বলে, অনেকের দৃষ্টিতে কথাটি "ঠিকই তো" ও হতে পারে! কিন্তু এই ছোট্ট কথাটিতে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর একটি ভ্রান্ত ধারনা, এমন একটি কুসংস্কার যা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে আমাদের মাঝে আর কারণ হয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে ভয়ংকর সব অমানবিক ঘটনার!
কথাটি আবারও দেখুন, "বাবা হচ্ছে বৃক্ষের ন্যায় আর মা ভুমির ন্যায়, বৃক্ষ হতে বীজ এনে জমিতে লাগালে তবেই নতুন শিশু চারাগাছ জন্মাবে"-
-একই গাছের বীজ/চারা অনেক জমিতে লাগানো যায়, আবার একাধিক প্রজাতির গাছের বিজ/চারা একই বাগানে লাগানো হতে পারে, কিন্তু সে যে গাছেরই বীজ/চারা যে জমিতেই লাগানো হোউক না কেন জন্মানো চারাগাছটি মাতৃ গাছেরই বংশধর হবে, সুধু দশমাস নয় আজীবন জমিতে দাঁড়িয়ে থেকে আজীবন সেই জমি থেকে সাড়-পানি খেয়ে বৃক্ষ বেচে থাকলেও বৃক্ষ কখনোই জমির বংশধর বা জমির সন্তান হিসেবে পরিগণিত হবে না, যে গাছের বিজে জন্মে চারাগাছ সেই গাছেরই বংশধর জমির নয়! অর্থাৎ "গাছ ও জমি" এর সাথে যথাক্রমে "বাবা ও মা"এর তুলনা এই ভুল ধারনা থেকে আসে যে বাবার দেহ থেকে আসা "এক বিন্দু" বীর্য থেকেই সম্পূর্ণ সন্তান ডেভেলপ হয়! এখানে ভুল হল গাছের বিজ হচ্ছে ভ্রূণ, অর্থাৎ যে বীজ ভুমিতে লাগালে নতুন চারা জন্মাবে সেটা আসলে বাবার বীর্য বা শুধুমাত্র শুক্রাণু নয় বরং বাবার শুক্রাণু ও মায়ের ডিম্বাণুর মিলনের ফলে যে সম্পূর্ণ ভ্রুন সৃষ্টি হয় বীজটি তাই! অর্থাৎ গাছের বীজ শুধু বাবার অংশ নয় যেমনটি ওই উক্ত কথাটিতে দাবি করা হচ্ছে, বীজ হচ্ছে বাবা ও মা এর দুজনারই অংশের মিলিত পরিপূর্ণ ভ্রুন! বেশিভাগ গাছ উভয়লিঙ্গ এর(অর্ধনারীশ্বর এর ন্যায়) হয়ে থাকে, অর্থাৎ গাছটি বাবা নয় বরঞ্চ বাবা ও মা দুইই! পরাগ হল শুক্রাণু বা বাবার থেকে আসা অংশ আর পরাগায়নের ফলে সেই বাবার অংশ মায়ের অংশ(ডিম্বাণু) এর সাথে মিলিত হলে তবেই বীজের সৃষ্টি! এক্ষেত্রে শুধু পরাগ বা শুধু ডিম্বানু বা অপরিপক্ক বীজ এনে জমীতে বুনে দিলে কখনোই চারাগাছ জন্ম হবে না! পরাগায়নের পর বাবা ও মায়ের অংশ মিলিত হওয়ার পর বীজ পরিপক্ক হয়ে লাগানোর উপযোগী হওয়ার পর জমিতে লাগালে তবেই তা চারাগাছ হতে পারবে!
অর্থাৎ "পিতা হচ্ছে বৃক্ষের ন্যায়" আর "নারীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র" কথাগুলো সেই প্রাচীন ভুল ধারনারই প্রতিফলন!
বাবার দেহ থেকে আসা বীর্য সম্পূর্ণ সন্তান জন্ম দেয় না! মায়ের দেহে থাকা ডিম্বানুর সাথে তা মিলিত হয়ে ভ্রুন সৃষ্টি হলেই তা থেকে সন্তান জন্ম হবে!
অথচ আগেকার দিনের মানুষদের এমনকি বড়বড় পন্ডিত বা ধর্মগুরুদেরও এইটা জানাছিল না মায়ের দেহে আগে থেকেই ডিম্বানু গুলো থাকে, যেটাতে মায়ের বংশের বংশগতির ফ্যাক্টর গুলো ততটুকুই থাকে যতটুকু বাবার থেকে আসা শুক্রাণু বহন করে, অর্থাৎ প্রতিটি সন্তান ততটুকুই মায়ের বংশধর যতটা বাবার!
আবার ছেলে সন্তান ভবিষ্যতে বাবা হবে আর মেয়ে হবে মা, অর্থাৎ আগের ভুল ধারণা অনুযায়ী বংশের বীজ ছেলে সন্তান বহন করবে আর ফরওয়ার্ড করবে যা মেয়ে সন্তান করতে পারবে না, আর এজন্যই আগের "ভুল ধারণা" অনুযায়ী ছেলে সন্তান কে বংশেরবাতি বলা হয় আর সুধু ছেলের ঘরের ছেলে সন্তান(নাতিকেই) বংশেরবাতি বলাহয়(ছেলের মেয়েদের আর মেয়ের সন্তানদের নয়)!
অথচ আধুনিক মেডিকেল সাইন্স বলে মেয়ে সন্তান মা হবে এবং X ক্রোমোজোম সহ বংশের বৈশিষ্ট্য বহনকারী ২৩টি ক্রোমোজোম সমৃদ্ধ ডিম্বানু বহন করবে আর তার সন্তানদের মদ্ধে বংশের বীজ ফরওয়ার্ড করবে, অর্থাৎ মেয়ে সন্তানও বংশের প্রদীপ, আর ছেলে ও মেয়ে দুইটি সন্তানই বাবা ও মা দুজনেরই বংশের প্রদীপ!
এখনও আরও কথা বাকি আছে! X ও Y ক্রোমোজোম এর কিছু পার্থক্য রয়েছে! X ক্রোমোজোম আকারে Y ক্রোমোজোম এর তুলনায় অনেক বড় হয় ও অনেক বেশী তথ্য বহন করে! Y ক্রোমোজোম প্রধান কাজ পুরো ভ্রুণের মধ্যে একটি পরিবর্তন আনা যা ভ্রুনটিকে ছেলে শিশু তে পরিণত করবে, Y ক্রোমোজোম না হলে এই পরিবর্তন হয় না আর শিশুটি মেয়ে হয়! আধুনিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে X ক্রোমোজোম মেধা ও পারসোনালিটি রিলেটেড গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য বহন করে! একটি ছেলে যার শরীরে XY ক্রোমোজোম থাকে আর সে সুধু মায়ের থেকেই X ক্রোমোজোম পায়, অর্থাৎ সে ততটাই মেধাবী হবে যতটা তার মা ও নানা/নানি মেধাবী! অপরপক্ষে মেয়ে বাচ্চা মা ও বাবা দুজনার কাছ থেকেই X ক্রোমোজোম পায় যার একটি সক্রিয় ও অপরটির বেশিরভাগ অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে! বেশিরভাগ অংশ নিষ্ক্রয় হওয়া X ক্রোমোজোমটিতে Y ক্রোমোজোমের সমপরিমাণ জিন সক্রিয় থাকে! এখানে দেখাযাচ্ছে যে একজন মেয়ের তার দাদী বা মা দুজনার যেকোনো একজনের আর ছেলের সুধু মায়ের X ক্রোমোজোম সক্রিয় থাকে, অর্থাৎ এখানেও মায়েদের ভুমিকাই দেখা যাচ্ছে! আর এটা সুধু লিঙ্গ নির্ধারক ক্রোমোজোম এর কথা বললাম, বাকি ২২টি বংশ বৈশিষ্ট্য বহনকারী ক্রোমোজোম ছেলে ও মেয়েরা সমান পায় ও প্রতিটি শিশু বাবার থেকে যা পায় মায়ের থেকেও তাই পায়, অর্থাৎ বাবা ও মা দুজনারই বংশ বহনকরে!
প্রতিটি জীব যে মায়ের বংশের যথেষ্ট বৈশিষ্ট্য পায় তার প্রমান হল হাইব্রিড জীব গুলো! সিংহ বাবা ও বাঘ মায়ের মিলনে যে লাইগার জন্ম হয় সেই লাইগারে সিংহ বাবা ও বাঘ মায়ের দুজনেরই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, বরং মায়েরই বৈশিষ্ট্য বেশি থাকে, যেমন বাঘের মত (আবছা) ডোরাকাটা দাগ থাকে, শরীরের গড়ন বাঘের মত হওয়া কিংবা পুরুষ লাইগারের সিংহের মত কেশর না হয়ে বাঘের মত হওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি!
সিংহ বাবা ও বাঘিনী মায়ের মিলনে জন্ম নেওয়া লাইগারের গায়ে মায়ের মত ডোরাকাটা দাগ দৃশ্যমান।
এতে প্রমান হয় সে তার মায়ের বংশের বৈশিষ্ট্য নিয়েও জন্মেছে!
যেব্রা আর গাধার মিলনে যে যিব্রয়েড বাছুর জন্মায় তারও বাবা ও মা দুজনারই বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়!
জেব্রা ও ঘোড়া বা জেব্রা ও গাধার মিলনে যে শাবক জন্মায় তা বাবা ও মা উভয় প্রজাতির বৈশিষ্ট্য নিয়েই জন্মায়! উপরের ছবিতে জেব্রা ও ঘোড়ার মিলনে জন্মানো জেব্রয়েডের গায়ের কিছুটা অংশ জেব্রার মত আবার কিছুটা সাদা ঘোড়ার মত অর্থাৎ উভয় প্রজাতি বা বাবা ও মা উভয়ের বংশের বৈশিষ্ট্য নিয়েই সে জন্মেছে!
মানুষের বাচ্চা হলে সেই শিশুর চেহারা ও পারসোনালিটি সুধু বাবা নয় বরং বাবা ও মায়ের দুজনারই পরিবারের মানুষদের সাথে যথেষ্ট মিল থাকে! আবার গাছ বা ফুলের ক্রস ব্রিডিং এর ক্ষেত্রেও নতুন প্রজাতিটিতে বাবা ও মা দুজনারই বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়! যদিও ক্রসব্রিডিং এর ফলে কোন কোন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাবে তা ডিপেন্ড করে বৈশিষ্ট্য বহনকারী জিন কতটা প্রকট তার উপর, অর্থাৎ যে জিন যতটা ডমিনেন্ট সে জিনের বৈশিষ্ট্য গুলো প্রকাশ পাবে, বাবার কোনও জিন ডমিনেন্ট হলে তার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাবে আর মায়ের কোনোটা ডমিনেন্ট হলে তা প্রকাশ পাবে! তবে প্রকাশ পাক আর নাই পাক, শিশু অবশ্যই মায়ের জিন বহন করবে, আর তার পরের প্রজন্মও সেই জিন প্রাপ্ত হবে!
মুরগি যখন ডিম দেওয়া বন্ধ করে দেয় তখন তার শেষ ঠিকানা কসাইখানা হয়, আর কোনও মুরগি যদি অন্য বাড়িতে গিয়ে ডিম পাড়ে তাহলে সেই মুরগির মালিক আরও আগে সেটাকে জবাই করে! আমাদের পাশের বাড়ির আন্টির একটা মুরগি অন্য বাড়িতে গিয়ে ডিম পারত তাই রাগে তিনি মুরগিটাকে অত্যন্ত বীভৎস ভাবে আছাড় মেরে মেরেফেললেন! শুনতে খারাপ লাগলেও বাস্তব কথা এইটাই যে আমাদের সমাজে মেয়েশিশুদের পরিস্থিতি অনেকটা ওই মুরগিটার মতই! "সন্তান জন্ম দিব আমি আর সেই সন্তান আমার বীজ বহন করবেনা, আবার মা হয়ে অন্য পুরুষের বংশধর গর্ভে ধারণ করবে! এই সন্তান বা মেয়েশিশু পালন করাটা সেই মুরগিকে (যেটা অন্য বাড়িতে যেয়ে ডিম দিয়ে আসল) দানা পানি খাওয়ানোর মতই মনে করা হয়! অর্থাৎ মেয়েশিশুকে বাঁচিয়ে রাখাটাও যেন তার প্রতি অকারণ দয়া দেখানো ছাড়া কিছুই নয়!"
আবার যেহেতু এই বিশ্বাস যে সুধু ছেলেরাই বংশের প্রদীপ আর মেয়েরা বংশ বহন করেনা সুধু স্বামীর বীজ ক্ষণিক গর্ভেধারণ করে মাত্র, তাই মেয়েদের অনেকটাই খালি পাত্রের মতও দেখা হয়, যার যেমন ইচ্ছা তার সাথে আচরণ করুক, সেতো আর মানুষ হিসেবে পুরুষের সমান নয়! কথাগুলো খারাপ লাগলেও সত্যি যে আমাদের আদি প্রথা, সামাজিক কুসংস্কার আর ভুল বিশ্বাস গুলো আমাদের এই মানসিকতা ধারণ করাচ্ছে, আর এই ভুল ধারনার কারনেই বৈসম্যের শিকার হচ্ছে নারী সমাজ, বঞ্চিত হচ্ছে সম অধিকার থেকে, আবার লাঞ্ছিত-নির্যাতিত হচ্ছে সমাজের দশজনের হাতে! রাস্তার বখাটেরা যেখানে সেখানে অপমান করছে, প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও বীভৎস ভাবে কুপিয়ে বা এসিড ছুড়ে দিচ্ছে! আবার ধর্ম ও পর্দানশীন সমাজ চোখের উপর পর্দা বেধে উলটা ভিক্টিম মেয়েটাকেই দোশারপ করছে! কারন ও মেয়ে, ও তো মানুষ নয়, ও ডিম না দেওয়া মুরগি কিংবা খালি পাত্র বা হস্তান্তর যোগ্য আসবাবপত্রের সমান, তাই মেয়েটির সম অধিকার/ন্যায় বিচার/মৌলিক অধিকার পাওয়ার দরকার নেই!
আমার এই কথা গুলো হয়ত খুব অফেন্সিভ লাগবে আবার সামাজিক প্রথা/বিশ্বাস বা ধর্মের সাথেও বিরোধপূর্ণও মনে হতে পারে, কেউ হয়ত এটা পড়ে আমাকে গালাগালিও করবেন! কিন্তু এটাই সত্য যে "মেয়েরা বংশের ধারক/বাহক প্রদীপ নয়" এমন ভুল বিশ্বাসই আমদের এত হাজার হাজার বছর ধরে নারী নির্যাতন করিয়েছে, ঐ ভ্রান্ত ধারনা আমাদের মধ্যে নারী নির্যাতনের মানসিকতার প্রসার করিয়েছে!
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আর মেডিকেল সায়েন্সের কাছে অকাট্য দলিল থাকা সত্যেও আমরা এই আধুনিক যুগেওও সেই প্রাচীন যুগের ভুল ধারনা গুলো ধরে রেখেছি! আর শুধুমাত্র এই ভুল ধারনাটির কারনে বৈসম্যের শিকার হচ্ছে পৃথিবীর লক্ষ-কোটি মেয়ে শিশু! তৃতীয় বিশ্বের ও ধর্মান্ধ সমজগুলোতে লাখ লাখ মেয়েশিশুকে গর্ভপাত করে হত্যা করা হচ্ছে কিংবা নবজাতক মেয়েশিশুকে জ্যান্ত অবস্থায় ময়লার মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, আর যে মেয়েটা ভাগ্যক্রমে বেচে গেল তাকে সহ্য করতে হয় আজিবন লাঞ্চনা!
"মেয়েরা বংশের ধারক/বাহক প্রদীপ নয়" -এই ভুল বিশ্বাসের কারণে আমরা জেন্ডারসাইড চালিয়েছি আর মেয়ে ভ্রুন হত্যা করেছি! জেন্ডারসাইডের মাধ্যমে নির্মম বীভৎস হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে কোটি কোটি মেয়ে শিশু ও আজও তা নির্বিচারে চলছে!
"স্ত্রী কে মারধর করাকে অপরাধ না মনে করা, স্বামী যখন যেমন খুশি আচরন করবে/দুর্ব্যবহার করবে/ইচ্ছে হলেই অকারণেই তালাক দিয়ে দিবে/স্ত্রীকে মানসিক ও ইমোশনাল অত্যাচার করবে/ফেলে চলে যাবে আবার অন্যত্র গিয়েও সেখান থেকেই অত্যাচার চালাবে -এগুলোকেও স্বামীর(পুরুষ হিসেবে) জন্মসূত্র অধিকার মনেকরা, স্ত্রীর/পাত্রীর কোনও তুচ্ছ/কাল্পনিক কোনও ত্রুটি highlight করে যৌতূক চাওয়া কে সঠিক ভাবা, একাধিক স্ত্রী ও দাসী (সঙ্গিনী) গ্রহন করা, স্ত্রী দাসী হইয়া স্বামীর সঙ্গে যাবে এমন ধারনা, স্ত্রী দাসী হয়ে স্বামীর পায়ে থাকবে এটাকে সঠিক নিয়ম মনে করা কিংবা স্ত্রীকে প্রয়োজনে মারধর করা যায় এমন ধারনা পোষণ করা, স্ত্রীলোক/মেয়েমানুষ স্বাধীন, স্বনির্ভর, সুশিক্ষিতা ও পুরুষের সমকক্ষ কখনোই হতে পারবে না, কিংবা মানুষ হিসাবে মেয়েরা পুরুষের সম অধিকার পাওয়ার যোগ্য নয়, কিংবা বাবা-মায়ের সম্পদের অংশ মেয়েরা পাবে না কিংবা পেলেও অধিকারে ছেলেদের সমান কখনওই হবে না, ছেলে সন্তান না থাকলে সম্পত্তি রক্ষার জন্য ভাইয়ের ছেলে/চাচাত ভাইকে দিয়ে দেওয়া, বাবা/স্বামীর বংশ পরিচয় ধারণ করা," -এই প্রতিটা কূৎসিত ধারনার জনকই ওই একটাই ভুল থিওরি "মেয়েরা বংশের ধারক/বাহক প্রদীপ নয়" যেটা আশ্চর্যজনক ভাবে আমরা এই বিজ্ঞানের যুগেও মানছি!
এ যুগে "নারী দিবস", "নারীর সমঅধিকার" মিনা কার্টুনের "মাইয়াগো যত্ন লও" কিংবা "পোলাই হইতে হইব এমন কোনও কথা নাই" বা "বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও" এর মত হাজারটি মানবিক আবেদনও মেয়েদের রক্ষা করতে ব্যর্থ কারন প্রতিটিতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিষকে ইগনোর করা হয়েছে, আর তা হল ওই "মেয়েরা বংশের ধারক/বাহক প্রদীপ নয়" এই ভুল ধারনাটিকে হটানোর চেষ্টা, আর এই ভুল ধারনাটি যতদিন আমাদের মাঝে প্রচলিত আছে আর যতদিন না আমরা সামাজিক ও ধর্মীয় প্রথার বাইরে যেতে পারব না ততদিন আমরা মেয়ে শিশুটিকে বাঁচাতে পারব না, আর ততদিন "বেটি বাচাও বেটি পড়াও"এর মত আবেদনগুলো আমাদের কাছে ডিম না পাড়া মুরগিকে হত্যা না করার আবেদনের মতই মনে হবে! আর তাই নারীর সম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে প্রথমে এই ভুল ধারনাটি মানুষের মন থেকে হটাতে হবে, মানুষদের সচেতন করতে হবে, এই জানাতে হবে যে সুধু ছেলে নয়, ছেলে ও মেয়ে দুজনেই বাবা ও মা দুজনারই বংশের বীজ বহন করে!
আমার এই লিখাটি পরে অনেকেই আমাকে অপছন্দ করবে, আমি যে অনেকেরই চক্ষুশূল হব আমি তা ভাল ভাবেই জানি! কিন্তু একজন ডাক্তার হিসেবে আমি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি আর এই কথা গুলো মানুষ কে জানানো আমার কর্তব্য মনেকরি! যদি আমার লেখা এই আর্টিকেল পড়ার কারনে একটি কন্যা শিশুও এ্যবর্শন থেকে রক্ষা পায়, যদি একজন বাবারও মন গলে, তবেই আমার লেখা সার্থক হবে!
আর তাই আমি আমার সব শিক্ষিত, শুভ চিন্তাশীল ও বিজ্ঞান মনস্ক বন্ধুদের অনুরোধ জানাব এই তথ্যটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য!
- ডাঃ আকাশ, শেখ আনোয়ার ঊল্লাহ খন্দকার!


